ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ে ১৬৫ কোটি এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ৮০ কোটি ডলারের প্রস্তাব।
চীনের সরকারি ও বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ১১টি কোম্পানি বাংলাদেশে মোট ৯২১ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গত বৃহস্পতিবার দেশটির বিভিন্ন খাতের প্রধান নির্বাহী ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফলপ্রসূ বৈঠকের পর এই বিশাল বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো সামনে আসে।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এই বিনিয়োগের অংকগুলো একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, “এই বিনিয়োগ প্রস্তাব তাদের (কোম্পানিগুলোর) পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখনো এগুলোর কোনো যাচাই-বাছাই করিনি। তাই এই বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা এখনই গ্যারান্টি দিতে পারছি না।”
প্রস্তাবিত বিনিয়োগগুলোর মধ্যে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর অধীনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মহাসড়কটির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এমন সময় চীনা কোম্পানিটি দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যখন চীন সরকার কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে মোংলা ও পায়রা বন্দরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব করেছে। বাংলাদেশ এ প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সরকারও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নয়নে পরিকল্পনা করছে। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ ইতোমধ্যে এই সড়ক উন্নয়নে ৭১,০০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। অন্যদিকে, সেতু বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়ককে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তর করতে প্রকল্প হাতে নিচ্ছে।
এছাড়া, চীনের ঝংশিন এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন গ্রুপ’ পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ১৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগে একটি অত্যাধুনিক ই-বর্জ্য (ইলেকট্রনিক বর্জ্য) রিসাইক্লিং অ্যান্ড ডিসপোজাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রজেক্ট স্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাংহাই এনভায়রোমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশে ৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। কোম্পানিটি নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এই বিনিয়োগ করতে চায়।
চায়না শানডং ঝংশিন ফার্মাসিউটিক্যাল বাংলাদেশে বড় পরিসরে ভেষজ ঔষধি উদ্ভিদের বাণিজ্যিক চাষ শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে। কোম্পানিটি এই খাতে ১৯ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এই প্রকল্পে উৎপাদিত সমস্ত ভেষজ পণ্য শতভাগ চীনে রপ্তানি করা হবে। এই মেগা প্রকল্পের জন্য ২৫,০০০ বিঘা জমির প্রয়োজন হবে এবং এতে প্রায় ৫০,০০০ স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চায়না কেপেল এডুকেশন গ্রুপ– বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য ২৭ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীনের বৃহত্তম রেলওয়ে রোলিং স্টক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান- সিআরআরসি জিয়াং—বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির সঙ্গে যৌথভাবে রোলিং স্টক অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এখাতে চীনা কোম্পানিটি ১৯ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া ১৯ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে রিসাইকেল তুলার উৎপাদন বাড়ানো, সিলিন্ড্রিকাল লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদন ও পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহী হুয়াসিন টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড।
চীনের বৃহত্তম লজিস্টিক্স কোম্পানি- এসএফ এক্সপ্রেস ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে মোংলা বন্দরে একটি কোল্ড চেইন লজিস্টিক্স অ্যান্ড বন্ডেড ওয়্যারহাউজ স্থাপন করতে চায়। এতে ই-কমার্স ও রপ্তানি সম্প্রসারণ হবে বলে কোম্পানিটি মনে করে।
২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে স্মার্ট ইলেকট্রিক মিটার উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কথা বলেছে শেনজেন কাফিয়া টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড।
চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (সিসিইসিসি) মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস নির্মাণ এবং নতুন চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ৬৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ইতিমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি যৌথভাবে গড়ে তোলার জন্য এই চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেছে।
এছাড়া চায়না ফিউচার এনার্জি গ্রুপ হোল্ডিংস রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্স-এর সঙ্গে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-এর আওতায়, ভোলা থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য ২৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।