1. admin@allianceray.org : admin :
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১১:০২ অপরাহ্ন

শিল্পবন্ধু মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনাবসান

  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ পড়া হয়েছে:

গত ২৯ জুন, ২০২৬ ঢাকার আকাশের মেঘগুলো সেদিন যেন একটু বেশিই ভারী ছিল। ৯০ বছর বয়সে জীবনের ক্যানভাসে শেষ তুলির টান দিয়ে ওপারে পাড়ি জমালেন এক জাদুকর। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশ থেকে খসে পড়ল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। মুস্তাফা মনোয়ার—যাঁকে আমরা একনামে চিনি পাপেট শিল্পের রূপকার হিসেবে। কিন্তু তিনি কি কেবলই একজন পাপেটিয়ার ছিলেন? নাকি ছিলেন আমাদের শৈশবের সেই জাদুকর, যিনি বোকা বাক্সের ভেতর আলো জ্বালতে জানতেন?

বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার ঘরে জন্ম নিয়েছিল এক আশ্চর্য শিশু। যার রক্তেই মিশে ছিল সৃষ্টিশীলতা। কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠ থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের স্কুল জীবন—সবখানেই তিনি খুঁজে বেড়াতেন রূপকথা। পরবর্তীতে কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে যখন দেশে ফিরলেন, তখন তাঁর চোখজুড়ে এক নতুন স্বপ্ন। তাঁর মাথায় ঘুরত—কীভাবে শিল্পকে ড্রয়িংরুমের দেয়াল থেকে বের করে সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষ করে শিশুদের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়?

মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি কতটা বিশাল ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চে। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তাঁর অসাধারণ নির্দেশনায় বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম’ গানটি। মাত্র ১০ জন শিল্পী গাইলেও তাঁর টেকনিক্যাল জাদুতে মনে হয়েছিল যেন শত শত মানুষ একসাথে গর্জে উঠছে, যা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের মনে আগুন জ্বালিয়েছিল—যা “একাত্তরের দিনগুলি” বইতেও উল্লেখ করা হয়েছে। এদেশের শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জন্য তিনিই রূপদান করলেন এক কালজয়ী অনুষ্ঠান—‘নতুন কুঁড়ি’র

কিন্তু মুস্তাফা মনোয়ারের আসল ম্যাজিকটা অপেক্ষা করছিল শিশুদের জন্য। নব্বই দশকের একটা প্রজন্ম বিকেল হলেই টিভির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকত। কেন জানেন? কারণ তখন পর্দায় আসত এক অদ্ভুত সুন্দর অনুষ্ঠান—‘মনের কথা’।

আর সেই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ‘ষাঁড় ভাই’। তবে তা সাধারণ কোন ষাঁড় নয়, সে বোকা, সহজ-সরল আর ভীষণ কৌতূহলী এক চরিত্র!  কেন্দ্রীয় চরিত্রে পারুল, শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার লোককথার একমাত্র বোন ‘পারুল’ চরিত্রটির মাধ্যমে মর্তে আবার এক নতুন সাংস্কৃতিক নবজাগরণ ঘটাতে চেয়েছেন। এবং সাথে থাকে বিচক্ষণ বাউল ।

মনের কথায় তিনি সমাজ, প্রকৃতি, আর মানুষের ভেতরের ভালো-মন্দকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে, শিশুরা হাসতে হাসতে, আঁকতে আঁকতে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা পেয়ে যায়। পুতুল দিয়ে যে আস্ত একটা প্রজন্মকে মানবিক করে গড়ে তোলা যায়, তা মুস্তাফা মনোয়ারের আগে এদেশের কেউ ভাবেনি। তাই তো তাঁকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘পাপেট শিল্পের পুরোধা’।

শিল্পের এই বহুমাত্রিক যাত্রায় তিনি শুধু পাপেটেই আটকে থাকেননি। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের সেই রক্তিম সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপন করা থেকে শুরু করে সাফ গেমসের ‘মিশুক’ ভাস্কর্য—শিল্পের প্রতিটি আঙিনায় তিনি ছিলেন এক অনন্য কারিগর। ২০০৪ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পদক ছিল এদেশের কোটি মানুষের ভালোবাসা।

পাপেট নাটকের একটা অলিখিত নিয়ম আছে—সব নাটক শেষেই পুতুলের সুতোগুলো গুটিয়ে নিতে হয়। ওপারে হয়তো কোনো এক মেঘের দেশে বসে তিনি এখন নতুন কোনো পুতুলের সুতো বাঁধছেন, আর পর্দার আড়ালে থেকে হাসছেন সেই চিরচেনা জাদুকরী হাসি।

শেয়ার করুন

এই ধরণের আরও নিউজ