1. admin@allianceray.org : admin :
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন

চলচ্চিত্র: সিন্ডিকেট, সিনেপ্লেক্স ও রাষ্ট্রীয় নীতি সংস্কারের এখনই সময়

  • প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩২ পড়া হয়েছে:

মাহমুদ নিয়াজ চন্দ্রদ্বীপ।।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প আজ একটি জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে দীর্ঘদিনের প্রযোজনা-নিয়ন্ত্রণের সংকট, অন্যদিকে আধুনিক প্রদর্শনী ব্যবস্থার একচেটিয়া প্রবণতা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্র তার স্বকীয়তা, বৈচিত্র্য এবং দর্শক হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে চলচ্চিত্রের প্রশ্নটি এখন আর কেবল বিনোদনের নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।

একসময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) ছিল দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে একটি সীমিত গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তার ঘটে, যা নতুন নির্মাতাদের প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং সৃজনশীলতার জায়গা সংকুচিত করে। বাণিজ্যিক ফর্মুলানির্ভরতা ও নিম্নমানের কনটেন্টের অভিযোগও এই প্রেক্ষাপটে উঠে আসে। যদিও এ কাঠামোর ভেতর থেকেও কিছু জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে একটি সংস্কার-অযোগ্য স্থবিরতা তৈরি হয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অন্যদিকে, ডিজিটাল যুগে আধুনিক সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতি চলচ্চিত্র প্রদর্শনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। Star Cineplex-এর মতো প্রতিষ্ঠান উন্নত প্রদর্শনী অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, যা দর্শকদের হলে ফেরাতে ভূমিকা রেখেছে। তবে একইসঙ্গে সীমিত স্ক্রিন, কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ এবং লাভকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের কারণে অনেক স্বাধীন ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এমন অভিযোগও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ফলে এক ধরনের “নতুন সিন্ডিকেট” নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে, যা মূলত প্রদর্শনী ব্যবস্থার কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার প্রতিফলন।

এই দ্বৈত সংকটের বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ ফেডারেশন-এর মতো সংগঠনগুলো বিশ্বমানের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, আলোচনা ও চর্চার মাধ্যমে দর্শকের রুচি গড়ে তুলেছে এবং চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থেকেও এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে—চলচ্চিত্র কেবল পণ্য নয়, এটি একটি চিন্তার ও সংস্কৃতির মাধ্যম।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই তিনটি শক্তিকে—এফডিসি, সিনেপ্লেক্স এবং চলচ্চিত্র সংসদ—বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সমাধান আসবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতিটি স্তরে ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং সৃজনশীলতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে।

প্রথমত, প্রযোজনা কাঠামোর সংস্কার জরুরি। এফডিসিকে আধুনিকায়ন করে উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সরকারি অনুদান ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন ও মেধাবী নির্মাতারা সুযোগ পান।

দ্বিতীয়ত, প্রদর্শনী ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে হবে। সিনেপ্লেক্সগুলোর পাশাপাশি জেলা-উপজেলায় আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দিতে হবে। একইসঙ্গে স্বাধীন ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্রের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন বা প্রদর্শনী কোটা চালু করা যেতে পারে, যাতে চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্য বজায় থাকে।

তৃতীয়ত, চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসার ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ নির্মাতা, প্রযুক্তিবিদ এবং সচেতন দর্শক তৈরি ছাড়া কোনো শিল্প টেকসই হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

চতুর্থত, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সহায়তা দিতে হবে। এই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক শক্তিকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি সুস্থ দর্শক-সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যা শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

পঞ্চমত, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও ডিজিটাল নীতিমালা শক্তিশালী করতে হবে। পাইরেসি রোধ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সুষ্ঠু বাণিজ্যিক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে নির্মাতারা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হবেন এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।

সবশেষে, চলচ্চিত্রকে জাতীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে তুলে ধরতে কো-প্রোডাকশন, চলচ্চিত্র উৎসব এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—সেখান থেকে উত্তরণের পথ একটাই: সিন্ডিকেটের সীমাবদ্ধতা ভেঙে, সিনেপ্লেক্সের সম্ভাবনাকে ন্যায্যতায় রূপান্তর করে, এবং আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে একটি নতুন চলচ্চিত্র বাস্তবতা নির্মাণ করা।

“সিন্ডিকেট নয়—স্বচ্ছতা চাই,
চলচ্চিত্র হোক শিল্পের জায়গায়।”

লেখক:

মাহমুদ নিয়াজ চন্দ্রদ্বীপ

চলচ্চিত্র পরিচালক ও কার্যনির্বাহী পরিষদ সদস্য , ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ।

ইমেইল: mahmudniaz10@gmail.com

শেয়ার করুন

এই ধরণের আরও নিউজ