কুমকুম ফকির।।
আমার উদ্যোক্তা জীবনের গল্পটি একটু ভিন্ন ধরনের।
ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকির প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন ধরনের পেন্সিল দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছবি আঁকতাম। অনেক সময় অজান্তেই কাগজে পোশাকের নকশা এঁকে ফেলতাম। তখন হয়তো বুঝিনি, সেই ছোট্ট অভ্যাসই একদিন আমার উদ্যোক্তা জীবনের ভিত্তি হয়ে উঠবে।
বড় হওয়ার পর আমার মা প্রায়ই কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও ফ্যাশন নিয়ে গল্প করতেন। তাঁর পোশাকের রুচি ও সৌন্দর্যবোধ মায়ের খুব প্রিয় ছিল। মায়ের সেই গল্প শুনতে শুনতেই ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে আমার কল্পনার জগৎ আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে। ধীরে ধীরে নিজের মতো কিছু সৃষ্টি করার স্বপ্ন হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
অল্প বয়সেই আমার বিয়ে হয়। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার, সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। আমার স্বামী একজন চিকিৎসক হওয়ায় পরিবারের অনেক দায়িত্বই আমাকেই সামলাতে হতো। তবে ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে কখনো হারিয়ে যেতে দিইনি।
একসময় উপলব্ধি করলাম, শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না—সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার উদ্যোক্তা জীবন।
একই সময়ে আমি মেধা কুঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষকতাও শুরু করি। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রতিটি অবসর সময় কাজে লাগিয়েছি নিজের স্বপ্নের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে।
শুরুর দিকে, আমি গজ কাপড় কিনে নিজের কল্পনা অনুযায়ী নতুন নতুন ডিজাইন তৈরি করতাম এবং টেইলার মাস্টারকে বুঝিয়ে দিতাম। তিনি প্রায়ই মজা করে বলতেন, “আপা, আপনি এমন ডিজাইন বলেন, যা আমার মাথার উপর দিয়ে যায়!”
একদিন তিনি আমাকে জানালেন, আমার ডিজাইন করা পোশাকগুলো দোকানের হ্যাঙ্গারে ঝোলানো ছিল। অনেক ক্রেতা এসে জানতে চাইতেন, “এই পোশাকগুলোর ডিজাইনার কে? তিনি কি অর্ডার নেন?” সেই মুহূর্তটি আজও আমার জীবনের অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা। তখনই নিজের মনে বলেছিলাম—স্বপ্নটা এবার বাস্তবে রূপ দিতে হবে- “No Risk, No Gain.”

সাহস করে অল্প কিছু মূলধন দিয়ে কাপড় কিনলাম এবং নিজস্ব ডিজাইনে পোশাক তৈরি শুরু করলাম। এরপর শুরু করলাম বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া। সময়ের পরিক্রমায় ক্রেতাদের ভালোবাসা ও আস্থায় আমার ব্যবসা এগিয়ে যেতে থাকে। আজও যখন কোনো ক্রেতা মেলায় এসে আমার স্টল খুঁজে বের করেন, তখন মনে হয় আমার পরিশ্রম সার্থক।
দীর্ঘদিন ধরে আমার দুটি উদ্যোগ অফলাইনে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে নতুন উদ্যমে অনলাইন কার্যক্রমও শুরু করেছি।
আমার দুটি উদ্যোগ, একটি নিজস্ব ডিজাইনের নারীদের পোশাক, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্য নিয়ে কাজ করছি, যেটা পরিচিত “Kumkum’s Petal” নামে।
আর “Kumkum REMPHA” হলো আমার সম্পূর্ণ অর্গানিক মসলা ও খাঁটি দেশি ঘি নিয়ে একটি উদ্যোগ যার লক্ষ্য, নানী-দাদীদের সময়ের বিশুদ্ধ স্বাদ, আস্থা এবং ঐতিহ্যকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া।
ঢাকার মিরপুর ডিওএইচএস এ আমার অফলাইন শোরুম রয়েছে। বর্তমানে অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও দুটি উদ্যোগের কার্যক্রম পরিচালনা করছি সমানতালে।
উদ্যোক্তা জীবনের পাশাপাশি সমাজের জন্য কাজ করার স্বপ্ন থেকেই শুরু করি আমার সাংগঠনিক যাত্রা।
আমি ফকির মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আমার চাচা ড. গোলাম সামদানী ফকির। এখানে নারী উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।
এছাড়াও আমার কয়েকজন সহযোদ্ধা বান্ধবীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করি মেঘনা উদ্যোক্তা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। বর্তমানে আমি এই ফাউন্ডেশনের কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।
দুটি ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য একই—তৃণমূল পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং তাদের জন্য একটি শক্তিশালী উদ্যোক্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।

আমরা নিয়মিত উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, পণ্য প্রদর্শনী, মেলা, নেটওয়ার্কিং, সচেতনতা কার্যক্রম এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করছি। আমাদের বিশ্বাস, একজন সফল নারী উদ্যোক্তা শুধু একটি পরিবার নয়, একটি সমাজ এবং একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন।
আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্ন তখনই সফল হয় যখন তার সঙ্গে যোগ হয় পরিশ্রম, সততা, ধৈর্য এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমার লক্ষ্য শুধু নিজের সফলতা নয়, বরং আরও অসংখ্য নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা।
প্রতিটি নতুন দিন আমাকে নতুন কিছু শেখায়, নতুন স্বপ্ন দেখায় এবং সমাজের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়।
লেখক: কুমকুম ফকির
প্রতিষ্ঠাতা, ফকির মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন নারী উন্নয়ন উদ্যোগ।
ইমেইল: kumkum.fakir2016@gmail.com