1. admin@allianceray.org : admin :
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

নারীর অধিকার কেউকি দেয়? অর্জন করতে হয়

  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৩৪ পড়া হয়েছে:

শাহিদা ইসলাম।।

আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ…

অনেক সময়,মনে মনে ভাবতাম কিছু একটা করলে কেমন হয়?

১৯৮০ সালে আমার বিয়ে হয়। তখন চার পাশে মানুষের বুটিক্স শপ দেখে খুব শখ হতো। দিন যায়, মাস যায়, চলে যায় বছরের পর বছরও। ১৯৯৫ সালে আমার মাথায় ঢুকল কিছু একটা করবই।

তখন ইন্টেরিয়র ডিজাইন খুব একটা মানুষের কনসেপ্ট ছিল না,আমি এটা নিয়ে পরিচিতজন ও আত্মীয় স্বজনের মাঝে কাজ শুরু করলাম। ধানমন্ডি আমাদের এক বড় ভাই পি ডি বি র ডাইরেক্টর ছিলেন। ভাইকে বললাম আপনার বাড়ির ডেকরেশনের কাজ আমাকে দিন, বাড়ির সমস্ত ডিজাইন এবং ফার্নিচার পর্দা বেড রুম সহ ডেকোরেশন করলাম, কাজ শেষ হবার পর ভাই আমাকে বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ দিলেন। নতুন কাজের জায়গা করে দিলেন তাঁর বন্ধু বান্ধবের বাড়িতে। গুলশান একটা হোটেলের ডেকোরেশন করলাম, সেখানেও বেশ প্রশংসা কুড়োলাম।

এবার গুলশান এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পেলাম, যিনি তার বাড়ি সাজানোর দায়িত্ব দিলেন। এত গুলি কাজ সফলাতার সাথে শেষ করার পর বেশ সাহস বেড়ে গেল। যদিও আমার এই বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা ছিল না। শুধু মাত্র নিজের চোখের মাপ আর মনের জোর দু,য়ে মিলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম,আস্তে আস্তে।

বেশকিছু দিন ইন্টেরিওর ডিজাইনিং নিয়ে কাজ করার পর মাথায় এলো বুটিক্স বিজনেস। মেয়েকে ভিকারুননিসা স্কুলে ভর্তি করলাম, ওকে স্কুলে গেটের ভিতরে দিয়ে বেইলি রোডের শাড়ির দোকান গুলিতে আলাপ আলোচনা শুরু করলাম। নিজেই ডিজাইন করতাম,আঁকতাম। আমার ডিজাইন করা কাপড় দেখালাম,এবং তাদের পছন্দ হলো, শুরু হলো নতুন পথ চলা।

আমার স্বামীর আপত্তি ছিল চাকুরী করার ক্ষেত্রে। তবে সেখানে শিথিল ছিল স্কুলে জব অথবা ব্যাংক হলে তার কোন আপত্তি নেই। আমি ভেবে চিনতে হাতের কাজ করার কাজটাই বেছে নিলাম। বেশ চলছিল কিন্তু, রমরমা বুটিক্স  ব্যবসা, কাজ আর আয়ের নেশায় ছুটছি, বেশ আনন্দও পাচ্ছি। গুলশানে একটা কারখানা দিলাম, সেখানে কারিগর প্রায় চার জন, সাথে আরো আশেপাশের এলাকায় থাকা বাসা থেকে কাজ করা নারী শ্রমিক ১০/১২ জন। এরা কাপড় বাসায় নিয়ে যেতো। সেলাই করে জমা দিয়ে যেতো। মজুরি নিতো প্রতিপিস হিসাবে।

এভাবে চলল বেশকিছুদিন। কিন্তু বাচ্চাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে দেখে আবার বন্ধ করে দিলাম।  স্বামী সাংবাদিক, প্রায়ই দেখা যেত পত্রিকার বেহাল অবস্থা, বেতন ই রেগুলার। সেই মুহুর্তে আমার কাজের টাকা বড় একটা সাপোর্ট দিত সংসারে, কিছু জমা করেও রেখেছিলাম, যা আমাদের নিজেদের একটা বাড়ি বানানোর সময় সহায়ক হয়েছে।

নারীকে শিক্ষিত এবং পরিশ্রমী হওয়া অবশ্যক। নারীরা বিপদে পড়লে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না। তখন এক মাত্র অবলম্বন নারীর শিক্ষা এবং কর্মক্ষমতা।

কাজের ক্ষেত্র কখনো মসৃণ হয় না। অনেক বার লোকসান হয়েছে,১৯৯৮ সালে দুই লক্ষ টাকা এক দোকানী মেরে দিল। সাংবাদিক সাহেব রেগে গিয়ে বললেন,সবার সব কাজ মানায় না,তুমি এসব বাদ দাও। এর মাঝে হোম মেড ফুড নিয়ে কিছু দিন কাজ করেছি ১৯৯৯ সালে একটা স্কুলের টিচারদের দুপুরের খাবার সরবারাহের কাজ করেছি,বাসা থেকে ওরাই নিয়ে যেতো। সেখানেও সফলতা পেয়েছি। বুটিক্সে কারখানা বন্ধ করার পর কিছুদিন আড়ং এর কাজ করে এমন শ্রমিকের সাথে যোগাযোগ করি। এরইমধ্যে একটা স্কুলে এপ্লাই করেছিলাম প্রি স্কুল এন্ড ডে কেয়ার সেন্টার। সেখান থেকে চিঠি এলো,জয়েন করলাম। সেখানে আমাকে কিছু স্পেশাল শিশুর যত্ন নিতে হতো। আমাকে খুব পছন্দ করতো বাচ্চাগুলো। এমন হয়েছে,  অন্য কারো হাতে খাবে না,ঘুমাবে না,বা কোলেও উঠবে না,সবাই জোট বেঁধে আমার কোলে উঠবে। কঠিনই ছিল সময়টা। আমি এই শিশুদের সাথে কিভাবে কথা বলব? ওদের ম্যানেজ করব কিভাবে? তার উপরে একটা ট্রেনিং নিলাম। এবার আমি দক্ষ একজন স্পেশাল চাইল্ড টিচার।

অনেকেই কথা বলতে পারে না,কেউ কেউ সব সময় কান্না করতো,খেতো না,একটা বাচ্চা শুধু রেগে গেলেই কামড় দিতো।আমি একদিন কোলে নিয়ে কার্পেটের উপর বসে আছি,বেখেয়ালে ছিলাম,হঠাৎ আমার হাত অবশ হয়ে গেল,সেই বাচ্চার কামড়ে। হাতে ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে এলাম,বাচ্চারা চিৎকার শুরু করল,সব শুনে বলল,এই স্কুলে আর চাকরি করতে হবে না। আমি হাল ছাড়ি নাই। সেই ছাত্রের মা আজও ফোন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সেই মায়ের চোখের আনন্দ অশ্রু আমি দেখেছি, অন্তরে আজও সেই সুখ স্মৃতি অনুভব করি।

কিছুটা খেয়ালের বশেই ২০১৯ সালে একটা রান্না প্রতিযোগিতায় অংশ নিই এবং এখানে দশম স্থান অধিকার করে নেই। আর তাতে করে একটা সুযোগ মিললো, ডেলিবি নামের একটা প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন নিত্যনতুন আইটেমের রান্না করে দিতাম,সকাল ১০টায় বাড়ির সামনে গাড়ি হাজির হতো,আমি ২০টা লাঞ্চ পাকেট খাবার রেডি করে রাখতাম, প্রতিটি প্যাকেট আলাদা আইটেম। সব মিলিয়ে চলছিল ভালোই।

২০২০ সারের ২৯শে এপ্রিল। জীবনের মোড় ঘুরে গেল আমার। আমার প্রাণ প্রিয় স্বামীটি চির নিদ্রায় চলে গেল, শোকের সাগরে ভাসমান হয়ে গেলাম। চারিদিকে বন্যার পানির মত থইথই পানিতে আমি হাবুডুবু খেতে লাগলাম। আত্মীয় স্বজন কেউ সামনে দাঁড়ায় নাই, নিজের শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা আমাকে শক্তি জোগালো। আবার সেই পুরানো কাজের খোঁজেই বেরিয়ে পড়লাম, বুটিক্স বিজনেস,এবার আমার ছেলে বউ সহযাত্রী।

আজ আমি নিজেকে পরিচিত করি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে। যুদ্ধে নেমেছি বারবার নিজের শক্তি আর মনোবল দিয়ে। নারীর অধিকার কেউকি দেয়? আমার মনে হয়, অর্জন করতে হয়।

লেখক: শাহিদা ইসলাম, কবি, নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন

এই ধরণের আরও নিউজ